ঢাকাThursday , 6 March 2025
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সাতকানিয়ার ছনখোলায় ‘গণপিটুনিতে’ দুই খুন,

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেক্স

March 6, 2025 10:24 pm
Link Copied!

অনলাইন ডেক্স:
সাতকানিয়ার ছনখোলায় ‘গণপিটুনিতে’ দুই খুন,

জামায়াতকর্মীদের কাছে ছিল কোতোয়ালী থানা লুটের অস্ত্র!

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলায় দুই জামায়াতকর্মী ‘গণপিটুনিতে’ খুনের ঘটনায় তোলপাড় চলছে। এরই মধ্যে পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর সামনে এনেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য।
পুলিশ বলছে, ওই দুই জামায়াতকর্মীর মরদেহের কাছে পাওয়া অস্ত্রটি ছিল ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন নগরের কোতোয়ালী থানা থেকে লুট হওয়া সরকারি অস্ত্র। এছাড়া অতিসম্প্রতি দফায় দফায় সেই এলাকায় ওই দুজন গিয়েছিলেন অন্তত ৮ বার। নিহত নেজাম-ছালেক চাঁদার জন্য চড়-থাপ্পড়ও মেরেছিলেন এক ইউপি সদস্যের স্ত্রীকে। যার ফলে, খুনসহ একাধিক মামলার দুই আসামির প্রতি ক্ষোভ জন্মেছিল এলাকাবাসীর।
যদিও ঘটনার পর জামায়াত ইসলামী দাবি করেছে, বিচার-সালিশের কথা বলে ডেকে নিয়ে এওচিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রকাশ মানিকের লোকজন তাদেরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।
তবে পুলিশ তদন্ত করে দেখেছে, সেখানে বিশেষ দলের কোনো ব্যক্তি বা চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততা ছিল না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরকার পতনের পর দেশে আসা নেজাম ও ছালেকের কাছে থানা লুটের অস্ত্র কীভাবে গেল—সেটিও তদন্ত করছে পুলিশ।
ওই এলাকায় ‘চাঁদার জন্য যেতেন ছালেক-নেজাম’
চট্টগ্রামের রাউজানে চাঁদা না পেয়ে শুটকি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের সম্পর্কে তথ্য জানাতে আজ বৃহস্পতিবার সকালে একটি সংবাদ সম্মেলন করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। ষোলশহর দুই নম্বর গেটে জেলা পুলিশ কার্যালয়ে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতুর কাছে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা সাতকানিয়ার সেই আলোচিত ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
উত্তরে পুলিশ সুপার বলেন, ‘সাতকানিয়ায় মারা গেছে নেজাম এবং ছালেক। ছালেকের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা রয়েছে, তার মধ্যে দুটি হত্যা। এছাড়া চুরি ও বিস্ফোরক আইনেও মামলা আছে। নেজামের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। তাদের গতিবিধি যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি, বিগত তিন মাসে ওই এলাকায় তারা বিভিন্ন কাজে গিয়েছেন অন্তত ৮ বার। ঘটনার দিন তারা ৭টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা যোগে গিয়েছিলেন। ওখানে যারা দোকানদার ছিল তাদের কাছে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন। এর চার-পাঁচদিন আগেও চাঁদার জন্য সেখানকার এক ইউপি সদস্যের স্ত্রীকে থাপ্পড় মেরেছিলেন তারা। এর ফলে স্থানীয়দের মাঝে একটা ক্ষোভ তৈরি হয়। তারা সেখানে চাঁদার জন্য যেতেন বলে আমরা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি।’
হত্যাকাণ্ডে মানিক চেয়ারম্যানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘একটা কথা উঠেছে, একটি বিশেষ দলের চেয়ারম্যান সেখানে ছিল কিনা। আসলে সেখানে বিশেষ দলের কোনো ব্যক্তি বা চেয়ারম্যানকে আমরা খুঁজে পাইনি কিংবা তাদের সম্পৃক্ততা কোথাও পাইনি। বরং নিষিদ্ধঘোষিত একটি ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের আমরা অবিরত খুঁজে যাচ্ছি। তাদেরকে ধরা আমাদের দায়িত্ব।’
কোতোয়ালী থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ছিল নেজামের কাছে—এমনটা জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘নেজাম ঘটনার দিন অস্ত্র প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি খুন হওয়ার পরে যে অস্ত্রটি পেয়েছি, সেটি সিএমপির কোতোয়ালী থানার লুট হয়ে যাওয়া অস্ত্র। গুলি করতে করতে অস্ত্রের গুলি শেষ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র কীভাবে তাদের কাছে গেল—বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। এগুলো আমাদেরকে খুঁজতে হচ্ছে। এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
তবে পুলিশের এই বক্তব্য ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের প্রচার সেক্রেটারি আইয়ুব আলী । তিনি বলেন, ‘গতকাল থানায় এ বিষয়ে কথা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, যেহেতু লুট হওয়া অস্ত্র—আদৌ আমাদের কর্মীর কাছে ছিল নাকি যারা হত্যা করছে তারা পরিকল্পিতভাবে দিছে; এটা তারা তদন্ত করছে। অস্ত্র কাদের কাছে ছিল এটা নিয়ে তো এখনো তদন্ত চলছে। আমাদের কাছে তথ্য আছে, মানিক নামে একজন ওই দুজনকে ফোন করে বিচারের কথা বলে ডেকে নিয়েছিল। নেজাম বা ছালেকের মোবাইল নম্বর দিয়ে কে ফোন করেছিল তাদেরকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছি প্রশাসনকে।’
পুলিশের অস্ত্র প্রদর্শন নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে এই জামায়াত নেতা বলেন, ‘হয়তোবা উনি (পুলিশ সুপার) ভুল বলেছেন। অস্ত্র প্রদর্শন করেছে সেটি উনি দেখেছেন? উনিতো ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এই তথ্য পুলিশকে যারা দিয়েছে তারাই নেজাম-ছালেককে হত্যা করেছে। হত্যার সময় হেলমেট পড়া লোক ছিল। প্রশাসনকে তাদের প্রথমে খুঁজে বের করতে হবে। আমাদের কর্মীরা সেখানে বিচারের জন্য গেছে, নাকি চাঁদাবাজির জন্য গেছে আর অস্ত্রটা কার—এসব পরে। আগে খুঁজতে হবে হেলমেট পরা ওরা কারা। ওদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তো সব বেরিয়ে আসবে।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে যা ঘটেছিল সেদিন
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মার্চ রাত ৯টার পর ৭টি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় নেজাম ও ছালেকসহ ১০ থেকে ১২ জন এওচিয়া ইউনিয়নের ছনখোলা এলাকার একটি দোকানের সামনে নামেন। সেখানে গিয়ে তারা অস্ত্র প্রদর্শন করেন। তখনই নিকটস্থ একটি মসজিদে তারাবির নামাজ শেষ হয়েছিল। ওই মসজিদ থেকে মাইকে ‘ডাকাত আসছে ডাকাত আসছে’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয় একাধিকবার।
একপর্যায়ে এলাকাবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে নেজাম ও তার সহযোগীদের ঘিরে ফেলে। এ সময় নেজামের সহযোগীরা জনতাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ সময় শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়। তবে ক্ষুব্ধ জনতার রোষ এড়িয়ে নেজামের সহযোগী জামশেদসহ অন্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু নেজাম ও ছালেককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের সক্রিয় কর্মী নেজাম উদ্দিন আওয়ামী লীগের আমলে দীর্ঘসময় এলাকাছাড়া ছিলেন। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলাকায় ফেরেন। এরপর এলাকায় নেজামের পক্ষে-বিপক্ষে দুটি গ্রুপ তৈরি হয়। তারা এরই মধ্যে একাধিকবার সংঘাতেও জড়িয়েছে। নেজাম ও তার পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠতে থাকে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই কাঞ্চনা এলাকা নেজাম উদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। মধ্যম কাঞ্চনা যায় রিফাতের হাতে। অন্যদিকে এওচিয়া এলাকা ভাগ করে নেন আবু তাহের আদাইয়া, জাহেদ ও ফরহাদ।
তিনদিনেও হয়নি মামলা
এদিকে, দুই জামায়াতকর্মীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এবং গ্রামবাসীর ওপর গুলি ছোঁড়ার ঘটনায় তিনদিন পেরোলেও হয়নি মামলা। তবে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় অস্ত্র আইনে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা হয়েছে। এখানে দুটি গ্রুপ পেয়েছি। একটা হচ্ছে গ্রামবাসী যারা গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে কোনো মামলা হয়নি। যারা মারা গেছে তাদের পক্ষ হতেও কোনো মামলা হয়নি। যেহেতু আমরা পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করেছি, সেহেতু আইন অনুযায়ী আমরা অস্ত্র আইনে মামলা করেছি।’

সম্পর্কিত পোস্ট
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com