ঢাকাSunday , 27 July 2025
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সন্তু লারমা-মনোগীতের গোপন বৈঠক: ভারতে বসে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসের ছক

প্রতিবেদক
অনলাইন ডেক্স

July 27, 2025 11:59 pm
Link Copied!

অনলাইন ডেক্স:
সন্তু লারমা-মনোগীতের গোপন বৈঠক: ভারতে বসে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসের ছক

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বাসিন্দা করুনালংকার ভান্তে ছিলেন পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সহসভাপতি। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কয়েক বছর পরই চলে যান ভারতে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে নাম বদলে মনোগীত জুম্ম নাম ধারণ করে নয়াদিল্লিতে বসবাস শুরু করেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত জুম্ম ল্যান্ডের স্বঘোষিত নেতা হিসেবে নিজের পরিচয় দেন তিনি। তবে ভারত সরকার তাকে পরিচিত করিয়ে দেয় বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে। আর এ পরিচয়েই ভারতে বসে পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্ত্রাসের ছক কষেন করুনালংকার। সম্প্রতি সরকারকে দেওয়া এক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সূত্র জানায়, মনোগীত ২০১৭ সালে প্রথম জুম্ম গোয়েন্দাদের নজরে আসেন। তখন ভারতের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের কাছ থেকে নেওয়া ৪১টি গ্রেনেড পার্বত্য এলাকার একটি অজ্ঞাত স্থানে জেএসএস কর্মীদের হাতে তুলে দেন। ওই বছরই এ সংক্রান্ত বেশকিছু ছবি ও ডকুমেন্ট আসে পার্বত্য এলাকা নিয়ে কাজ করা নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের হাতে।
সূত্র বলছে, গত ৩ মে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মূল নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) চিকিৎসার কথা বলে ভারত সফর করেন। তার এ সফর নজরদারিতে রাখেন গোয়েন্দারা। চিকিৎসার নামে ভারতে গেলেও তিনি কোনো ডাক্তার দেখাননি বা হাসপাতালে ভর্তি হননি। সরাসরি দিল্লিতে মনোগীত জুম্মর বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সেখানেই কয়েকদিন অবস্থান করেন। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তালিকাভুক্ত একাধিক সন্ত্রাসী ওই বাড়িতে আসা-যাওয়া করে। সেখানেই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে পার্বত্য এলাকায় অস্থিরতা সৃষ্টির নতুন ছক তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত বছরের জুলাই আন্দোলনকে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে সেখানে অবস্থান করা জেএসএসের একটি পক্ষকে দিয়ে অনলাইনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ও পার্বত্য এলাকায় বসবাস করা বাঙালিদের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। যার অংশ হিসেবে পাহাড়ের সামাজিক সহিংসতা, এমনকি ছোটবড় রাজনৈতিক সংঘাতকেও জাতিগত সংঘাত হিসেবে অপপ্রচার করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তৎপরতা বাড়ানো। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২৬ জুন রাঙামাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রকাশ্যে সশস্ত্র মহড়া দেয় জেএসএস সদস্যরা। এতে শুধু শিক্ষার্থী নন, শিক্ষক-কর্মকর্তারাও ভীত হয়ে পড়েন।
নিরাপত্তা সূত্র বলছে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২৭ বছর পার হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি এখনও অধরা। বরং চুক্তির আড়ালে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জেএসএসের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি অনুযায়ী সংগঠনটির সশস্ত্র সদস্যদের ৪৫ দিনের মধ্যে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অস্ত্র জমা না দিয়ে বরং গোপনে সশস্ত্র শক্তি বাড়িয়েছে জেএসএস। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে তুলেছে গোপন ঘাঁটি।
সূত্রের দাবি, সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের সুযোগে দুর্গম এলাকায় গড়ে উঠেছে জেএসএসের অস্ত্রঘাঁটি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র। ধর্মীয় আশ্রমের আড়ালেও রাখা হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। রাঙামাটির বাজার কিংবা খাগড়াছড়ির পাড়াগুলোয় প্রকাশ্যে সশস্ত্র টহল দিচ্ছে সংগঠনটির অস্ত্রধারীরা। এতে করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা জানান, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা চৌকির অভাব এবং দুর্বল নজরদারির কারণে জেএসএস পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে অনায়াসেই অস্ত্র আমদানি করছে। সন্দেহ করা হচ্ছে, এসব অস্ত্র রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে চালানো সন্ত্রাসী কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভারত থেকে অস্ত্র আনতে গিয়ে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি মিজোরামের লুংলাইতে তিন জেএসএস সদস্য অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়। তাদের সঙ্গে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর যোগাযোগ থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। গত ৩ জুন ভারতের ত্রিপুরা থেকে আরো ১৩ জেএসএস সদস্য আটক হয়, যারা চিকিৎসার কথা বলে ভারতে গিয়ে ত্রিপুরার বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তত্ত্বাবধানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলো।
এ ছাড়া ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৭০০ জন জেএসএস সদস্য প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরেছে বলে তথ্য রয়েছে ওই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. ছালেহ শাহরিয়ার জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠন আছে। কিন্তু এর মধ্যে বর্তমান বাস্তবতায় জেএসএস জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বেশি হুমকি। কারণ এ সংগঠনটির সঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগের ভালো সম্পর্ক। এ ছাড়া ভারতের সঙ্গেও তাদের রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ। তাই বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ও ভারত যদি অস্থিরতা তৈরির মিশনে নামে, তবে জেএসএসকে সবচেয়ে সহজে ব্যবহার করতে পারবে। তাই এখনই জেএসএসের অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের লাগাম না টানলে শুধু পার্বত্য এলাকা নয়, গোটা দেশের স্থিতিশীলতাই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

সম্পর্কিত পোস্ট
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com