নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ডিসি পাহাড়ে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, নীরব কর্তৃপক্ষ।
(আনোয়ার হোছন)
কক্সবাজারের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ৫১ একর বনভূমি এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ডিসি পাহাড়’ নিয়ে ফের সমালোচনার ঝড় উঠেছে। পাহাড় কেটে অবৈধ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগের পর এবার জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেখানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে ৩০০ বসবাসকারী পরিবার ও ২০০ প্লট মালিকের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে মোট এক কোটি টাকা সংগ্রহের অভিযোগও পাওয়া গেছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে পাহাড়টিতে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ ইতিমধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের দাবি, সেখানে নতুন সংযোগ দেওয়া হয়নি; কেবল বিদ্যুৎ লাইন উন্নয়নের কাজ করা হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে আলোচিত এই ৫১ একর বনভূমি লিজ নেওয়ার নামে অবৈধভাবে দখল করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৬ সালে প্রায় ২৮টি বুলডোজার ব্যবহার করে পাহাড়টির প্রায় ৩০ ফুট অংশ কেটে সমতল করা হয়। পাহাড় কাটা ও ভূমির দখল নিয়ে একের পর এক মামলার পর বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত ভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নোটিশ জারি করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সে নোটিশ এখনো উক্ত এলাকায় লাল সাইনবোর্ডে দৃশ্যমান। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সেখানে একের পর এক স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। এবার সেই বিতর্কিত ভূমিতে বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগ নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় কীভাবে সেখানে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর কাজ এগোচ্ছে, কারা এর অনুমোদন দিয়েছেন এবং অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে কারা জড়িত-এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারি আবাসন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা কমিটির এক কর্মকর্তা বলেন-ট্রেজারী শাখার নাছির উদ্দিন, রামু ভূমি অফিসের অফিস সহকারী সুলতান মোহাম্মদ বাবুল ও সমাজ কমিটির ক্যাশিয়ার নুরুল ইসলাম ঘর প্রতি ২০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। বসবাসরত তিনশত পরিবার ও দুইশত প্লট মালিকদের কাছ থেকে মোট এক কোটি টাকা সংগ্রহ করেন তারা। উক্ত টাকা বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগে উৎকোচ দিয়ে এই সংযোগ আনা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে রামু ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক সুলতান মোহাম্মদ বাবুল বলেন, ‘আপনারা বিষয়টা ওভাবে না দেখে একটু মানবিক দৃষ্টিতে দেখেন। আমরা আপনাদের ভাই।’ আপনি একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে সরকারের দেয়া নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে পারেন কিনা? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি আপনার সাথে সরাসরি দেখা করে কথা বলছি’ এবং সমাজ কমিটির ক্যাশিয়ার নুরুল ইসলাম বলেন-‘এবিষয়ে আমি কিছুই জানি না।’
অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি বলেন-ওখানে আমরা কোনো সংযোগ দিই নাই। আমরা শুধুমাত্র লাইন উন্নয়ন করে দিচ্ছি। নিয়মিত ঐ এলাকায় বিদ্যুৎ চুরি হয়, সম্প্রতি ১৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই এলাকায় স্থাপনা নির্মাণে জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তার জানা নেই। তবে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকলে সেখানে কোনো ধরনের সংযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।
বিতর্কিত পাহাড়ে স্থাপনা নির্মাণের নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন- ‘বিষয়টি আমি জানি না। খতিয়ে দেখতেছি।’
সরকারি বনভূমির দখল, পাহাড় কাটা, স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ এবং এবার বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্যোগ-সব মিলিয়ে ৫১ একরের এই ভূমি ঘিরে প্রশাসনিক নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিতর্কিত সরকারি ভূমিতে কার স্বার্থে এবং কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজ চলছে তা দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।





