কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনকালে গুতেরেস-কিম

জসিম সিদ্দিকী, কক্সবাজার: জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতিয়েরেস বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। বিষয়টি জাতিসংঘ প্রথম থেকেই পর্যবেক্ষণ করছে। রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
উখিয়া বালুখালী ট্রানজিট ক্যাম্প, কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে বিকেল ৩টায় উখিয়ার কুতুপালং এক্সটেনশন ক্যাম্পের ডি-ফাইভ ব্লকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, গত ১১ মাস ধরে বিভিন্ন মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের চালানো নিপীড়নের কথা শুনছিলাম। আজ নিজে সরাসরি রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের নিপীড়নের কথা শুনলাম। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের শরীরে এখনো মিয়ানমারের সেনাদের চালানো নির্যাতনের ভয়াবহ চিহ্ন আছে। রোহিঙ্গারা তাদের উপর চালানো নির্যাতনের যেই বর্ননা দিয়েছে তাতে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে।
গুতেরেস বলেন, সব অধিকার দিয়েই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চান তারা। এই জন্য বিশ্বসম্প্রদায়কে আরও জোরালো ভূমি রাখার আহ্বান জানান তিনি। রোহিঙ্গাদের সহসাই ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সময়সাপেক্ষ বলে মনে করেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, রোহিঙ্গাদের বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যেই মানবতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বে নজিরবিহীন ঘটনা। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে।
বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, রোহিঙ্গাদের কষ্ট আর তাদের অসহায়ত্ব দেখে নিজেকেই একজন রোহিঙ্গা মনে করছেন। নিজেকে রোহিঙ্গা মনে করেই তিনি রোহিঙ্গাদের কষ্ট অনুভব করছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়ার জন্য বিশ্ব ব্যাংক সব সময় প্রস্তুত। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে অঙ্গীকার করেন কিম।
এর আগে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মুখে মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের কথা শুনলেন সফররত জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে সকাল পৌনে নয়টার দিকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করেন আন্তোনিও গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিম।
২ জুলাই বেলা ১১টার দিকে উখিয়ার ঘুমধুম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিদর্শন করেন তারা। এ সময় তারা সেখানে আশ্রয় নেয়া নতুন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। রোহিঙ্গারা তাদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। পরে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের খাবার ও চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম ঘুরে দেখেন। প্রায় ১ঘণ্টা অবস্থান শেষে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে যান গুতেরেস ও ইয়ং কিম।
তাদের সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র প্রধান ফিলিপ্পো গ্রান্ডি এবং জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ড. নাতালিয়া খানেমসহ জাতিসংঘের অধীন বিভিন্ন সংস্থার প্রায় ডজন খানেক কর্মকর্তা। এদিকে, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা পেলেই নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গারা বলেন, ‘আমরা বলেছি, নাগরিকত্ব পেলে মিয়ানমার ফিরে যাবো। আমরা তাদের (গুতেরেস-কিম) কাছে বিচার দিয়েছি। জানিয়েছি, আমরা দেশহীন মানুষ। জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক প্রধানদের কাছে এ কথাই বলেছি আমরা। হত্যা ও ধর্ষণের বিচার চাই। আন্তর্জাতিক আদালতে তাদের বিচার হোক।’ গুতেরেস-কিম বলেন, ‘সুন্দরভাবে থাকো। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’
এদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে সফররত জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এক টুইটার পোস্টে রোহিঙ্গাদের কাছে শোনা সেসব নিপীড়নের বর্ণনাকে ‘অকল্পনীয়’ আখ্যা দিয়েছেন। আর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, সফরের এই কর্মসূচিগুলোর পর বেলা ৩টার সময় কুতুপালংয়ের ডি-ফাইভ সেন্টারে প্রেস বিফ্রিং করেন তাঁরা।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আফরুজুল হক টুটুল বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্রবতার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সরেজমিন দেখতেই কক্সবাজারে এসেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট।
গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে থাকে মৌসুমী বাতাসে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় অন্তত ৭ লাখ রোহিঙ্গা।
২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে সংঘটিত নিধনযজ্ঞের ঘটনায় আন্তর্জাতিক চাপ জোরালো হওয়ার পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তিতে বাধ্য হয় মিয়ানমার। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কথিত বৈধ কাগজপত্রের অজুহাতসহ নানা কারণে প্রক্রিয়াটি এখনও বিলম্বিত করে যাচ্ছে মিয়ানমার। তবে একজন রোহিঙ্গাও ওই চুক্তির আওতায় রাখাইনে ফিরেছে বলে জানা যায়নি।
বিকালে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম ঢাকার উদ্দেশে কক্সবাজার ত্যাগ করেন।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের আগমনকে ঘিরে কক্সবাজারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সাদা পোশাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি বাড়তি ৩ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মতামত দিন