অডিও ক্লিপিং নিয়ে তোলপাড়

সংবাদ: সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানে শুরুর পর গত ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফ যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও পৌর কাউন্সিলর একরামকে ‘বন্দুকযুদ্ধের নামে মৃত্যুর ঘটনায় একটি অডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছে একরামের স্ত্রী আয়েশা খাতুন। গত বুুধবার কক্সবাজারে আয়েশা খাতুন তার স্বামী কাউন্সিলর একরামকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ এনে মৃত্যুর আগ থেকে মৃত্যু পরবর্তী সময় পর্যন্ত কথোপকথনের ১৪ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডের ওই অডিও প্রকাশ করে। অডিও ক্লিপটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে। অডিও ক্লিপটিতে শুনে জানা গেছে, মৃত্যুর আগে কাউন্সিলর একরামের সাথে তার মেয়ের কথা হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু স্ত্রী কথা বলার সময় গুলির শব্দ শুরু হয়। এরপরই মা ও মেয়ে চিৎকার করে ওঠেন কাউন্সিলর একরাম নির্দোষ বলে। একরামকে গুলি করার কথোপকথোন রেকর্ড শোনা গেছে রেকর্ডে। একরামের হাতে পিস্তল দেয়া, অস্ত্র চারদিকে ছড়িয়ে দেয়ার নির্দেশনা এবং বাঁশির হুইশেল ও শর্টগানের গুলি করে চিৎকার চেঁচামেচি করতে শোনা গেছে অডিও রেকর্ডটিতে।

অডিও রেকর্ড বর্ণনা অনুযায়ী

কল হওয়ার পর হ্যালো বলে উঠেন কাউন্সিলর একরামের মেয়ে।

অপরপ্রান্ত থেকে কাউন্সিলর একরাম বলেন, মেয়ে প্রশ্ন করে বলেন কোথায়

মেয়ে তখন বলেন বাসায়, কেন?

একরাম : আমি ইয়েতে যাচ্ছি যে ওই যে মেজর সাহেব ডাকছে। কি জন্য যে ওখানে যাচ্ছি।

মেয়ে : দেরি হবে যে

একরাম : দেরি হবে না মা যাচ্ছি।

মেয়ে : হ্যালো আব্বু তুমি কোথায়?

একরাম : আমি টিএনও অফিসে যাচ্ছি।

মেয়ে : কতক্ষণ লাগবে

একরাম : এইতো বেশিক্ষণ লাগবে না মা। চলে আসবো ইনশআল্লাহ।

মেয়ে : হ্যালো আব্বু। হ্যালো

একরাম : জি আম্মু আমি নিলা যাচ্ছি

মেয়ে : নিলা কেন?

একরাম : একটা জরুরি কাজে যাচ্ছি মা। এরপরই কেঁদে ফেলেন একরাম ।

মেয়ে : জরুরি কাজে কেন?

একরাম : কেঁদে ফেলে কিছু বলেন। (স্পষ্ট নয়)

মেয়ে : আব্বু তুমি কাঁদাছো কেন :

এরপরই একরামের স্ত্রী ফোন ধরেন। কিন্তু কোন কথা হয় না। আল্লাহ আমার মোবাইলটা যেনো ধরে। আমাকে কমিশনারের সাথে কথা বলতে দে? একরামের স্ত্রী আল্লাহকে ডাকতে থাকেন।

একরামের স্ত্রী : হ্যালো কে? কে? হ্যালো আমি কমিশনারের সাথে কথা বলতে চাই। আমি কমিশনারের স্ত্রী।

অপর প্রান্ত থেকে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছিল তাহলে তুমি মাদকের সাথে সংশ্লিষ্ট নও।

একরাম : না।

এরপরই একটি গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপর একরামের গোঙানির শব্দ শোনা যায়। পরে দুটি গুলির শব্দ শোনা যায়। অপর প্রান্ত থেকে গুলির শব্দ পেয়েই চিৎকার করে কাউন্সিলের স্ত্রী বলে উঠেন আমার স্বামী কিছু করে নাই। কমিশনার কিছু করে নাই। কাউন্সিলের স্ত্রীর সাথে তার মেয়েরাও কান্না করে চিৎকার করতে থাকেন।

একজন বলে ওঠেন কুত্তার বাচ্চা। আগে সিসা লোড কর। এরপর বাঁশির হুইশাল। চিৎকার চেঁচামেচি। এরপর বেশ কিছুক্ষণ থেমে থেমে গুলির শব্দ।

একজন বলে উঠেন ফায়ার করে না। আরেকজন বলেন, এতো জোরে কেন? একজনকে খোসার বিষয়েও কথা বলতে শোনা গেছে। এর মধ্যে স্থানীয় একজন সোর্সের গলাও শোনা গেছে। অডিও রেকর্ডে। এরপর একজনকে বলতে শোনা গেছে, দুটি এলজি দে। আশপাশে কয়েকটা ফেলে দে। একজন বলছে দুইটা দেয়া হয়েছে। আর পকেটেও দেয়া হয়েছে। তখন একজন বলে উঠলো ওই পকেটে কেন দিবি। ওর হাতে পিস্তল দে। ওই পকেট থেকে বের কর (ধমক দিয়ে)। ইয়ার্কি পেয়েছো পকেটে দিয়ে দিলাম (কাউকে তাচ্ছিল করে)। এরপর কত রাউন্ড গুলি করা হয়েছে এসব নিয়েও কথা বলতে শোনা গেছে অডিও রেকর্ডে। একজনকে ১০ রাউন্ড গুলি করার কথা বলতে শোনা গেছে। আরেকজনকে বিভিন্ন শব্দ উচ্চারণ করতে শোনা গেছে।

একজন বলে উঠেছে, ভাইকেও গুলি করা লাগবে।

এদিকে এ অডিও রেকর্ড প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে র‌্যাবের হাতে বন্দুকযুদ্ধের নামে একরামের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একরামের মৃত্যুর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বন্দুকযুদ্ধের নামে একরামের মৃত্যুর পর থেকে সারাদেশে বন্দুকযুদ্ধ এবং মাদকবিরোধী অভিযানে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে ।

অডিও রেকর্ড এবং সংবাদ সম্মেলন সম্পর্কে জানতে চাইলে র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান টেলিফোনে সংবাদকে বলেন, অডিও রেকর্ডটি আমরা শুনেছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

এ বিষয়ে সন্ধ্যার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল একটি বার্তা সংস্থাকে বলেছেন, আমি অডিওটি এখনও শুনিনি। অনেকে আমাকে প্রশ্ন করেছে। যেহেতু এরকম একটি কথা এসেছে, এটা তো ইনকোয়ারি ছাড়া কিছু করা যাচ্ছে না। আমি বিষয়টি ইনেকোয়ারি করে দেখব। তদন্তে কেউ যদি দোষী সাব্যস্ত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, এ ধরনের সব হত্যাকান্ডের বিচারিক তদন্ত হওয়া দরকার। আইনকে ‘পাশ কাটিয়ে’ কাজ করতে গেলে যে বিপদ ঘটতে পারে, একরামের ঘটনায় তা ‘স্পষ্ট হয়ে গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান একে বর্ণনা করেছেন ন্যায় বিচার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের জন্য ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে।

একরামের বড় বড় ভাই নজরুল ইসলাম বলেছেন, একরামের ফোন খোলা ছিল বলে এ প্রান্তে পুরো ঘটনা প্রবাহ রেকর্ড হয়েছে ফোনের অটোরেকর্ডারে।

মতামত দিন