রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে যেন রোগের বসতি!

নিউজ ডেস্ক: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র কথা খুব মনে পড়ছে। জেলেপাড়ার হতদরিদ্র মানুষের দুর্দশার চিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর থাকেন ওই গ্রামে, ভদ্রপল্লীতে। এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’ সেই জেলেপাড়ার মতোই অবস্থা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর। তাদের কষ্টে যেন ঈশ্বর মুখ লুকিয়েছেন। মিয়ানমারে জাতিগতভাবে সুবিধাবঞ্চিত এ জনগোষ্ঠীনিজ দেশে স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত ছিল, রোগ প্রতিরোধক টিকা কর্মসূচিরও (ইপিআই) বাইরে রাখা হয় তাদের। আর জীবন রক্ষায় বাংলাদেশে আশ্রয় পেলেও রয়েছে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি। পাশাপাশি দূষিত পানি পান, রান্না, গোসলের কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, হেপাটাইটিস-এ ভাইরাস ছড়াচ্ছে। ক্যাম্পের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। পুষ্টির অভাবে বাড়ছে না বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরীর শরীর। ডিপথেরিয়া, কলেরা ও হামের মহামারীর ঝুঁকিতেও রয়েছে রোহিঙ্গারা।

সীমান্তবিহীন চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়ারস (এমএসএফ)’ বলছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তারা প্রতিমাসে গড়ে ৬৫ হাজার ৬৩৯ জনকে চিকিৎসা দিচ্ছে। এর মধ্যে গড়ে ৬ হাজার ১২৫ জনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। আর ক্যাম্পে স্থাপিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা ফিল্ড হাসপাতালের মাধ্যমে প্রতিমাসে গড়ে ৮০৫ জনকে ডিপথেরিয়া এবং ৪৭৯ জনকে হামের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থাটির তথ্যমতে, বেশির ভাগ শরণার্থীর ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ক্যাম্পে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের মাত্র ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ হওয়ায় অতিপ্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার বড় ঘাটতি রয়েছে।সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, বর্ষা মৌসুমে ক্যাম্পে স্বাস্থ্য দুর্যোগ দেখা দেয়। ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে পানিদূষণে দ্রুত রোগ ছড়িয়ে বিপর্যয় হতে পারে। কেননা কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা খাবার, রান্না, তৈজসপত্র পরিষ্কার ও গোসলের জন্য অনিরাপদ পানি ব্যবহার করছে। গভীর নলকূপ স্থাপনসহ পানি সরবরাহ করা হলেও অনেকেই এখনো নিরাপদ পানিবঞ্চিত। তারা পানি ধারণ ও ব্যবহারকালে জীবাণুমক্তকরণেও অভ্যস্ত নয়। পুরো ক্যাম্পে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। ফলে পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি ঠা-াজনিত রোগেরও প্রাদুর্ভাব। এ ছাড়া যারা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা রোগের উপসর্গ দেখা দেয়, তারাই মূলত চিকিৎসা নেয়। এতে অনেকেই এক সময় বড় রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্যমতে, ৩০টি ক্যাম্পে ১২৪টি সংস্থা রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে। ক্যাম্পভিত্তিক সেবাকেন্দ্র বা প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র কিংবা ফিল্ড হাসপাতালের মাধ্যমে কেবল জটিল নয়, এমন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রধানত পানিবাহিত ও অপুষ্টিজনিত সেবা প্রদানই ইপিআই কর্মসূচির লক্ষ্য। ক্যাম্পে চিকিৎসা সম্ভব না হলে, সে রোগীকে কক্সবাজার সদরে পাঠানো হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জটিল রোগ ধরা পড়লে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রোহিঙ্গা ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তথ্যমতে, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, গর্ভকালীন জটিলতা, সার্জারি, টিউমার, পিত্তথলি, জন্ডিস, রক্ত সঞ্চালন, পানিবাহিত রোগ, হেপাটাইটিস বি এবং সি, এইচআইভি বা এইডস রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয় সেখানে। গত এক বছরে সদর হাসপাতালের ইনডোরে ৪ হাজার ৭২১ অসুস্থ রোহিঙ্গাকে সেবা দেয়া হয়, যাদের ১৭৪ জনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। চট্টগ্রাম মেডিক্যালে পাঠানো হয় ৯২ জন সার্জারি (হাড়, মাথা, ব্লাড, পিত্তথলিতে পাথর) এবং আঘাতপ্রাপ্ত (বুলেট, হাড়ভাঙ্গা, অবশ, গল ব্লাডারে পাথর) ২৬ রোগীকে। আর সব ক’টি সংস্থা মিলে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭ রোগীকে বিভিন্ন প্রকার সেবা দিয়েছে।কক্সবাজার হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য ইপিআই কর্মসূচি ছিল না। পল্লী চিকিৎসকই ছিল তাদের ভরসা। তাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, গর্ভকালীন জটিলতা, টিউমার, পিত্তথলির মতো পুরনো রোগ রয়েছে। বিতাড়নের সময় আবার অনেকের হাড় ভেঙে গেছে। এখানে এসে আক্রান্ত হয়েছে পানিবাহিত রোগে। এত সমস্যার মধ্যে সমন্বিতভাবে সেবা দিয়ে আসছি।’জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর প্ল্যাটফর্ম ‘ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপে’র (আইএসসিজি) তথ্যমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রোগের প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি মেডিক্যাল ওয়াস্ট ম্যানেজমেন্টেও রয়েছে বড় ধরনের সমস্যা। পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি জটিল রোগের চিকিৎসাও সংকট। তবে জাপানভিত্তিক এনজিও সংস্থা ‘ফিউচার কোড’ ক্যাম্পে জমাটবদ্ধ পানিকে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে কাজ করছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি মেজর সাকিব বলেন, ‘জাপানে এ প্রযুক্তি খুবই জনপ্রিয়।’এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্য সমস্যার মতো অপুষ্টিতে আক্রান্তের হারও দিন দিন বাড়ছে। সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, অপুষ্টির কারণে ক্যাম্পে ৪০ শতাংশ কিশোর-কিশোরীর শারীরিক বিকাশ হচ্ছে না। আরআরআরসির তথ্যমতে, ক্যাম্পে বর্তমানে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৭৭৮ রোহিঙ্গাই অপুষ্টিতে ভুগছে। এর অধিকাংশই শিশু ও গর্ভবতী নারী। ১২ হাজার ৬৬৮ শিশু পুষ্টিজনিত সমস্যা নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হয়। যদিও ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৩ জনকে ৪৫ শতাংশ পুষ্টিসেবা দেয়া হয়েছে।

মতামত দিন