রোহিঙ্গাদের কারনে হুমকির মুখে পরিবেশ

Porebas-Day.-2.jpgকক্সবাজার : উখিয়া ও টেকনাফের সাড়ে ৬ হাজার একর জায়গার ৩২ টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। মানবিক কারনে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও তারা উজাড় করেছে ৫ হাজার ৫ শত একর বনভূমি। রোহিঙ্গাদের কারনে মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বনের পশু-পাখি। তারা বন্ধ করে দিয়েছে হাতি চলাচলের ১২ টি করিডোর। শুধু বনভূমি আর পশু-পাখির ক্ষতি হচ্ছে তাই নয় দূষিত হচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সহ উখিয়া-টেকনাফের পরিবেশ। এমনটাই বলছেন সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে দূর্ষিত হচ্ছে বাতাস, ছড়াচ্ছে রোগ-বালাই, নষ্ট হচ্ছে শ্রমবাজারের পরিবেশ, ধ্বংস হচ্ছে বাঙ্গালীর সংস্কৃতির পরিবেশ। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান না করলে হুমকির মুখে পড়ছে পুরো কক্সবাজার।
উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের পাদদেশ থেকে উচু পর্যন্ত একটু পর পর রয়েছে টয়লেট আর নলকূপ। এর মধ্যে উপরে থাকা অনেক টয়লেটের নোংরা মানব বর্জ্য গড়িয়ে পড়ছে নীচে। এ থেকে ছড়াচ্ছে দূর্গন্ধ। দূর্ষিত হচ্ছে পরিবেশ। এছাড়া বেশিরভাগ নলকূপ দেখা যায় অকেজো অবস্থায় রয়েছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপ সহকারী প্রকৌশলী কামরুল হাসান জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৭ হাজারের কাছাকাছি টয়লেট রয়েছে। সরকারী ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও সংস্থার উদ্যোগে এসব টয়লেট তৈরী করা হয়েছে। টয়লেটগুলোর মধ্যে বেশ কিছু অকেজো হয়ে পড়েছে। যেনতেনভাবে অপরিকল্পিত টয়লেট স্থাপনের কারনে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এই জন্য তিনি কিছু এনজিও সংস্থাকে দায়ী করছেন। নলকূপের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাড়ে ৪ হাজারের মত নলকূপের মধ্যে প্রায় অর্ধেক’ই অকেজো। যার কারনে ওই এলাকার পরিবেশের উপর মারাত্মকভাবে প্রভাব পড়ছে।
উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, একসময় সবুজে ঘেরা বনভূমি এখন নেড়া হয়ে গেছে রোহিঙ্গাদের কারনে। সবুজ হারিয়ে যাওয়া ওই এলাকার পরিবেশের মারাত্বক ক্ষতি হয়েছে।
এ ব্যাপারে কক্সবাজার পরিবেশ সংরক্ষন ফোরামের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু জানান, রোহিঙ্গারা যে বনভূমি ধ্বংস করেছে তা ফেরত পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছেনা। সবচেয়ে বড় সমস্যা হল তারা বনভূমি উজাড় অব্যাহত রেখেছে। ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে তার প্রভাব পুরো কক্সবাজারবাসীর উপর পড়বে। তাই পরিবেশ বাচাঁতে হলে এখনই বন্ধ করতে হবে এই ধ্বংসলীলা।
কক্সবাজার দক্ষিন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আলী কবির জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের নির্যাতনে গত ২৫ আগষ্ট থেকে রোহিঙ্গারা এদেশে আসা শুরু করেছে। সেই থেকে তারা বন উজাড় করছে। আজ অবধি রোহিঙ্গারা ৫ হাজার ৫ শত একর বনভূমি ধ্বংস করেছে। আর এই ধ্বংসের কাজ অব্যাহত রয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী রোহিঙ্গারা দৈনিক ৪ টি ফুটবল সমান বনভূমি ধ্বংস করেছে। আর বনভূমি যতই ধ্বংস হচ্ছে ততই বনের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
শুধু তাই নয় রোহিঙ্গাদের কারনে ওই এলাকার পরিবেশ দূর্ষিত হচ্ছে বাতাসে ছড়াচ্ছে জীবানু। বাংলাদেশ থেকে ৩০ বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া ডিপথেরিয়া সহ নানা রোগ বালাই বেড়েছে রোহিঙ্গাদের কারনে। বেড়েছে এইচআইভি রোগীর সংখ্যা।
বিষয়টি স্বীকার করে কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. আবদুল সালাম জানান, অপরিকল্পিত স্যানিটেশন সহ নানা কারনে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা হবে। ইতিমধ্যে ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের কারনে পরিবেশ দূষনের ব্যাপারে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন জানান, অল্প জায়গায় অতিরিক্ত মানুষের বসবাস হওয়ায় বেশকিছু জায়গায় নোংরা ও দূর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। এর ফলে শুধু ওই এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছেনা কষ্ট পাচ্ছে রোহিঙ্গারা।
রোহিঙ্গা শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ আবুল কালাম আজাদ জানান, একজায়গায় এত মানুষ বসবাস করলে পরিবেশের উপর প্রভাব পড়তেই পারে। বর্ষায় পাহাড়ে ঝুকিপূর্ণ পরিবেশে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া এনজিওগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশ যাতে স্বাস্থ্যসম্মত থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ করে যেতে।
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব জানান, রোহিঙ্গাদের কারনে ধ্বংস হচ্ছে বন ও পাহাড়। এই ক্ষতি আদৌ পূরণ হবে কিনা বুঝা যাচ্ছেনা। এছাড়া তাদের কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ। ওই এলাকার পানির সূত্রগুলো দূর্ষিত হচ্ছে রোহিঙ্গাদের কারনে। আর অব্যাহত রয়েছে এই দূষন পক্রিয়া। সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছেন এভাবে চলতে থাকলে পুরো কক্সবাজারের পরিবেশ হুমকির সম্মুখিন হবে। তাই পরিবেশ রক্ষার্থে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী হয়ে পড়েছে।

মতামত দিন