ওমরা পালনের নামে দেশ ছাড়লেন বদি

  • প্রতিনিধি, কক্সবাজার:
image

সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে মাদকের গডফাদার হিসেবে তীব্র আলোচনায় থাকা কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুর রহমান বদি হঠাৎ ওমরা পালনের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন। গতকাল ভোরে সৌদি এয়ারলাইন্সের একটি বিমানযোগে তিনি হজরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ওমরা পালনে সৌদি আরবের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের স্কুল বন্ধু নুরুল আকতার, গিয়াস উদ্দিন ও উখিয়ার হলদিয়া পালংয়ের মৌলানা আলী আহমদ নূরী। এর আগে গত ২৬ মে এমপি বদির মেয়ে সামিয়া রহমান ও জামাই ব্যারিস্টার রানা আশরাফ ওমরা পালনের উদ্দেশে সৌদি আরব যান। এদিকে টেকনাফসহ সারাদেশে আলোচনা ঝড় ওঠেছে বদিকে নিয়ে।

এমপি বদির ব্যক্তিগত সহকারী হেলাল উদ্দিন জানান, মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে এমপি বদির হঠাৎ ওমরা পালনে সৌদি আরবে গমনকে অনেকে কৌশল হিসেবে মনে করলেও এটি সঠিক নয়। ওমরা পালনের সিডিউল অনেক আগেই নেয়া ছিল। অভিযান শুরু হওয়ার পর ফ্লাইট হওয়ায় তিনি অভিযান থেকে বাঁচতেই ওমরায় চলে গেছেন বলে ধারণা করছেন অনেকে। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নিয়েছেন এবং রমজানের শেষ সপ্তাহজুড়ে তিনি মসজিদ আল-হারামে ইতেকাফ করার নিয়ত করেছেন। ওমরা পালন শেষে ১৭ জুন দেশে ফিরবেন তিনি। এদিকে মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে এমপি বদির হঠাৎ দেশত্যাগ করে সৌদি আরবে গমনকে কৌশল হিসেবে মনে করছেন অনেকে। অভিযান থেকে বাঁচতে বদি ওমরায় চলে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সৌদি আরবে যাওয়ার আগে এমপি বদি জানান, অভিযানের ভয়ে তার দেশ ছাড়ার তথ্যটি সম্পূর্ণ অসত্য। তিনি অনেক আগে ওমরা পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতিও নিয়েছেন।

এদিকে সম্প্রতি টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে বদির দুঃসম্পর্ক বেয়াই, যুবলীগ নেতা আকতার কামাল মেম্বার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হন। এ ঘটনায় সংবাদ ও যোগাযোগ মাধ্যমে নানা আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জানান, ওমরাহ পালন তার ব্যক্তিগত বিষয়। তবে মাদকবিরোধী অভিযানকে এড়িয়ে এই মুহূর্তে ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরব গমন তার উচিত হয়নি। মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাহায্য করার প্রয়োজন ছিল তার। সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর জানান, এ সংকট পরিস্থিতিতে উখিয়া টেকনাফের মানুষকে অনিশ্চিতের দিকে ঠেলে দেয়া তার উচিত হয়নি। তিনি ভালোর পক্ষে এবং অবৈধের বিপক্ষে ভূমিকা পালন করতে পারতেন। কিছুদিন পরে ওমরাহ পালন করলে তার তেমন সমস্যা হতো না বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে, কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির উত্থান এক যুগ আগে হলেও আলোচনায় উঠে এসেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে। গত ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সর্বশেষ অবৈধ সম্পদ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রোষানলে পড়েন। সেই সঙ্গে ইয়াবা পাচারের গড়ফাদারের ভূমিকার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হয়ে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বদি। এর আগে টেকনাফ পৌরসভার মেয়র থাকাকালে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। তবে এমপি হওয়ার পরে হয়ে ওঠেন বেপরোয়া। একের পর এক ঘটিয়ে চলেন বিতর্কিত সব ঘটনা। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে কেউই বাদ যাননি বদির লম্বা হাত থেকে। লঘু অপরাধে গুরুদন্ড দেয়ার গুণের জন্যই সারাদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়ে ওঠেন বদি।

২০১১ সালের ২৯ জানুয়ারি টেকনাফ পৌরসভা নির্বাচনে চাচা মো. ইসলামের জন্য ভোট কারচুপিতে বাধা দেয়ায় এমপি বদির মারধরের শিকার হন নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এরপর একে একে তার হতে মার খেতে হয়েছে শিক্ষক, আইনজীবী, প্রকৌশলী বন কর্মকর্তাদের। সর্বশেষ বদির হাতে লাঞ্ছিত হন নিজ দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর এমপি। ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বদির অনুরোধে সাড়া না দেয়ায় বীর বাহাদুরকে লাঞ্ছিত হতে হয়।

ইয়াবা গড়ফাদার

দেশে বর্তমান সময়ের প্রধান ও আলোচিত মাদক ইয়াবার নাম উঠলেই এমপি বদির প্রসঙ্গ উঠে আসে। জনশ্রুতি আর অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের শুরুতেই এমপি বদি তার লোকজন দিয়ে মায়ানমার থেকে মরণনেশা ইয়াবা বাংলাদেশে পাচার শুরু করে। সেই থেকে পুরো বাংলাদেশ ইয়াবায় সয়লাব হয়ে যায়। তিনি আড়ালে থেকে তার ভাই, বোন, ভাগিনা, বেয়াই ও কর্মীদের দিয়ে ইয়াবা পাচার চালিয়ে আসেন। বদি গড়ফাদার হিসেবে অন্তরালে থাকলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইয়াবা পাচারকারীর তালিকার শীর্ষে রয়েছে বদির ভাই মো. আবদুল শুক্কর ও মৌলভী মুজিবুর রহমান, দুই সৎ ভাই আবদুল আমিন ও ফয়সাল রহমানের নাম। এ চার ভাইকে দিয়ে এক অপ্রতিরোধ্য ইয়াবা সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন আবদুর রহমান বদি। চার ভাই ছাড়াও ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এমপি বদির স্ত্রী সাবেকুন্নাহার সাকী, বেয়াই আখতার কামাল, শাহেদ কামাল, মামা হায়দার আলী ও মামাতো ভাই কামরুল ইসলাম রাসেল। এছাড়া পারিবারিক এ মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করেছেন বোনের ছেলে নীপুকে। এদের সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও গত ১২ আগস্ট চকরিয়া থানা পুলিশের হাতে আটক হন স্ত্রী সাবেকুন্নাহার সাকী।

দুদকের জালে

৫ জানুয়ারির ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ নিয়ে দুদকের রোষানলে পড়েন বদি। নির্বাচনী হলফনামায় দাখিল করা আয়কর নথির সঙ্গে বর্তমান সম্পদের অসামঞ্জস্য থাকায় ২৯ জানুয়ারি বদির আয়কর নথি ও হলফনামা জব্দ করে দুদক। বদির সম্পদের অনুসন্ধানে এসে দুদকের উপ-পরিচালক আহসান আলী কক্সবাজার থেকে বদির হলফনামা ও আয়কর বিবরণী জব্দ করেন। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) বদির হলফনামার তথ্য অনুসারে, প্রথম এমপি হওয়ার পর পাঁচ বছরে তার আয় বেড়েছে ৩৫১ গুণ। আর নিট সম্পদ বেড়েছে ১৯ গুণের বেশি। তার এ সম্পদ অবৈধ কিনা তা খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

অভিযোগ রয়েছে

বদি গত পাঁচ বছরে আয় করেছেন ৩৬ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার ৪০ টাকা। টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে মায়ানমারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও টেকনাফে জ্বালানি তেলের ব্যবসা করে এ টাকা অর্জন করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি। নির্বাচনী হলফনামা অনুসারে, এমপি বদির বার্ষিক আয় সাত কোটি ৩৯ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৮ টাকা। আর বার্ষিক ব্যয় দুই কোটি ৮১ লাখ ২৯ হাজার ৯২৮ টাকা। এর আগে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জমা দেয়া হলফনামায় বার্ষিক আয় ছিল দুই লাখ ১০ হাজার ৪৮০ টাকা। ব্যয় ছিল দুই লাখ ১৮ হাজার ৭২৮ টাকা। তখন (২০০৮) বিভিন্ন ব্যাংকে আবদুর রহমানের মোট জমা ও সঞ্চয়ী আমানত ছিল ৯১ হাজার ৯৮ টাকা। পাঁচ বছরের মাথায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট কোটি পাঁচ লাখ ১০ হাজার ২৩৭ টাকা। তার হাতে ২০০৮ সালের নভেম্বরে নগদ টাকা ছিল দুই লাখ সাত হাজার ৪৮ টাকা। আর এখন ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া এখন স্ত্রীর কাছে নগদ টাকা আছে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২৬৫ টাকা। আয়কর বিবরণীতে বদি দেখিয়েছেন ৭ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৮ টাকা। আর নিট সম্পদের পরিমাণ বলা হয়েছে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজার ৫৬৩ টাকা। পাঁচ বছর আগে ২০০৮ সালের আয়কর বিবরণী অনুসারে, তখন তার বার্ষিক আয় ছিল দুই লাখ ১০ হাজার ৮৮০ টাকা। আর নিট সম্পদ ছিল ৪৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮৩ টাকার। দুদক অনুসন্ধান চালিয়ে আবদুর রহমান বদির ১০ কোটি ৮৬ লাখ ৮১ হাজার ৬৬৯ টাকার অবৈধ সম্পদের খোঁজ পায়। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত ২১ আগস্ট বদির বিরুদ্ধে ঢাকার রমনা থানায় মামলা করে দুদক। এ মামলায় রোববার উচ্চ আদালতের নির্দেশে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মতামত দিন